Gaza 13

খেজুরের কাঁচা রসে ভয়ংকর নিপা ভাইরাস

বাংলাদেশ

২০০৫ সালের একটি গবেষণা্য় দেখা গেছে, খেজুরের কাঁচা রসে ভয়ংকর নিপা ভাইরাস রয়েছে যা পান করার মাধ্যমে মানুষে মাঝেও সংক্রমিত হচ্ছে। বাদুড়ের মুখের লালা বা মল দ্বারা দূষিত হয় এই রস। এছাড়াও, বাদুড়ের আংশিক খাওয়া ফল থেকেও নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ ঘটতে পারে। 

খেঁজুরের রস সংগ্রহ করার জন্য গাছে হাঁড়ি বাঁধা হয়। বাদুড় সেই বাঁধা হাঁড়ি থেকে রস খাওয়ার চেষ্টা করে বলে ওই রসের সাথে তাদের লালা মিশে যায়।এবং সেই বাদুড় যদি নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে থাকে তাহলে ওই রস খেলে মানুষের মধ্যেও ছড়িয়ে পড়তে পারে এ ভাইরাস।

১৯৯৮ সালে সর্বপ্রথম মালয়েশিয়ায় নিপাহ ভইরাস শনাক্ত করা হয়। সে সময় ২৫৭ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয় এবং মারা যায় ১০৫ জন। মালেশিয়ার কেমপুং নিপাহ শহরে এ ভাইরাস প্রথম সংক্রমিত হয় বলে এই শহরের নামানুসারে ভাইরাসটির নাম নিপাহ ভাইরাস রাখা হয়। নিপাহ ভাইরাস হেনিপাহ গোত্রের একটি ভাইরাস।

বাংলাদেশে সর্বপ্রথম ২০০১ সালে নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণের বিষয়টি ধরা পড়ে। ২০০১ সাল থেকে এ পর্যন্ত ৩৩৯ জন নিপাহ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ২৪০ জন মারা গেছেন। এই রোগে আক্রান্ত রোগীর মৃত্যু হার কোভিড থেকে ৭০ শতাংশ বেশি। । মেহেরপুর জেলায় নিপাহ ভাইরাসের প্রথম প্রাদুর্ভাব চিহ্নিত হয়।

এরপর থেকেই নিপাহ ভাইরাসের সংক্রমণ বাংলাদেশে বেশি দেখা গেছে মেহেরপুর, রাজশাহী, পাবনা, ঠাকুরগাঁও, কুষ্টিয়া, মানিকগঞ্জ, নাটোর, নওগাঁ; ফরিদপুর, রাজবাড়ী ও শরীয়তপুর জেলায়। তবে এবার নিপাহ ভাইরাস ঢাকার কাছের নরসিংদী জেলায় ছড়িয়েছে। জনস্বাস্থ্যবিদ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ‘নতুন করে নরসিংদী জেলায় নিপাহ ভাইরাসের রোগী পাওয়ার অর্থ হলো এ ভাইরাস এখন দেশের অন্য এলাকায় বিস্তৃত হয়ে পড়ছে এবং খুব শীঘ্রই এর বিস্তৃতি রোধ করা প্রয়োজন।

আরো পড়ুন :  ২৫ হাজার টাকায় যাওয়া যাবে রাশিয়া

শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ভাইরাস বিশেষজ্ঞ নজরুল ইসলাম বলেন, খেজুরের রস বিক্রেতারা যেভাবে নিরাপদ রস বিক্রির কথা বলছেন, তা একেবারেই ভ্রান্ত। বাদুড়ের লালা এবং মল রসে গিয়ে পড়ে। মশারি বা জাল দিয়ে এর সুরক্ষা কোনোক্রমেই সম্ভব নয়।

আইইডিসিআরের গবেষণায় দেখা যায়, চলতি বছর দেশে একজন প্রসূতির বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া গেছে।পরবর্তীতে ওই মায়ের সন্তানের মৃত্যু ঘটে।

এ ব্যাপারে অধ্যাপক তাহমিনা শিরীন বলেন, বুকের দুধে নিপাহ ভাইরাসের উপস্থিতি পাওয়া সারা বিশ্বে একটি বিরল ঘটনা যা দুশ্চিন্তার আগাম ইঙ্গিত দেয়। তিনি আরও জানান, অনেকেই মনে করেন, রস গরম করে খেলে ভাইরাস থাকবেনা। কিন্তু তা মোটেও সঠিক ও নিরাপদ নয়। ‘নিপাহ ভাইরাস সংক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য কোনোভাবেই খেজুরের কাঁচা রস খাওয়া যাবে না। এছাড়াও, যেকোনো ফল ভালো করে ধুয়ে খেতে হবে। গাছের নিচে পড়ে থাকা বাদুড় বা অন্য প্রাণীর খাওয়া আংশিক খাওয়া কিংবা ফাটা ফল খাওয়া যাবে না। এ ছাড়া আক্রান্ত ও ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় খেজুর গুড় ও রস, আখের রস, পেঁপে, পেয়ারা, বরইয়ের মতো ফল না খাওয়া ভালো।

আরো পড়ুন :  ২৯৮ আসনে আওয়ামী লীগের নতুন মনোনয়ন পেলেন যাঁরা

বাদুর বা পাখি ছাড়াও আক্রান্ত মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে নিপাহ ভাইরাস। আক্রান্ত ব্যক্তির থুথু, লালা, মলমূত্রের মাধ্যমে অন্য ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারে। নিপা ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ৪ থেকে ৪৫ দিন পর রোগের লক্ষণ প্রকাশিত হয়।

নিপা ভাইরাসে আক্রান্ত হলে প্রথমে প্রচণ্ড জ্বর, মাথাব্যথা, শরীর ব্যথা, গলায় ক্ষত, বমি হওয়া এসব লক্ষণ  দেখা দেয়। পরে মাথা ঘোরানো, খিচুনি ও শ্বাসকষ্ট দেখা দিতে পারে। একপর্যায়ে রোগী প্রলাপ বকতে শুরু করে এবং অজ্ঞান হয়ে পড়ে।

নিপাহ ভাইরাসের জন্য সঠিক কোনো ওষুধ বা প্রতিরোধক কোনো ভ্যাকসিন এখনো আবিষ্কৃত হয়নি। তবে, আশা করা হচ্ছে আগামী বছর এ ভাইরাসের প্রতিষেধক টিকা আবিষ্কার হবে। এ রোগে আক্রান্তদের পরিচর্যা করতে বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করতে হবে। রোগীর ব্যবহৃত কাপড় ও অন্যান্য সামগ্রী ভালোভাবে পরিষ্কার না করে আবার ব্যবহার করা যাবে না। রোগীর পরিচর্যা করার পর হাত ভালোভাবে ধুয়ে জীবাণুমুক্ত করতে হবে। রোগীর কফ ও থুতু যেখানে সেখানে না ফেলে একটি পাত্রে রেখে পরে পুড়িয়ে ফেলতে হবে। আক্রান্ত ব্যক্তির পরিচর্যার সময় মাক্স ব্যবহার করতে হবে।

বর্তমানে  ভারতের কেরালায় নতুন করে আতঙ্ক তৈরি করেছে এই নিপা ভাইরাস।এছাড়াও, বিভিন্ন দেশে এর উপস্থিতি জানা যাচ্ছে। এটা এখনই নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে, পরিস্থিত ভয়ানক হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেন জনস্বাস্থ্যবিদরা। তাই এ রোগ প্রতিরোধে সবাইকে সচেতন হতে হবে।

 

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *